মেসি তখন ‘অচেনা’, বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা

মেসি তখন ‘অচেনা’, বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা

ফুটবলের ভক্ত হলে তো কথাই নেই। যাঁদের আগ্রহ নেই তাঁদের কাছেও পরিচিত নাম লিওনেল মেসি। মোট কথা, মেসিকে না চেনার মতো মানুষের সংখ্যা খুব বেশি না। গত দেড় দশক ধরেই মেসি এ গ্রহের অন্যতম খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ। ক্যারিয়ারে অর্জন ও খেলা দিয়ে মেসি এখন বৈশ্বিক ক্রীড়া তারকাদের একজন। বিশেষ করে বার্সেলোনার হয়ে। আর্জেন্টাইন তারকার বেলায় ‘সকাল দেখেই বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে’ প্রবাদটি নির্ভেজাল সত্য। ২০০৫ সালে দেশকে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জেতান মেসি। তখন তাঁর বয়স ১৮ বছর।

তবে মেসির ক্যারিয়ারে এমন সময়ও এসেছিল যখন তিনি আর দশজন ফুটবলারের মতোই পায়ের তলে মাটি খুঁজছেন। এমনকি তাঁর সতীর্থরাও তাঁকে সেভাবে চিনত না। ২০০৫ অনূধ্বর্-২০ বিশ্বকাপ গড়িয়েছিল নেদারল্যান্ডসে। তার আগেআর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে একটি ফ্যাক্স পায় বার্সেলোনা। যুব দলের ফুটবলার ‘লিওনেল মেচ্চি/মেক্কি’কে ছাড়তে বার্সাকে এ চিঠি দিয়েছিল এএফএ। নামটা ওভাবে লেখার কারণ, এফএ-র সে চিঠিতে মেসির নাম ভুল লেখা হয়েছিল। ইংরেজিতে লিখেছিল এএফএ। ফিরতি চিঠিতে যুব কোপা ডেল রে টুর্নামেন্টের জন্য তাঁকে দরকার। সে চিঠিতে বার্সা অবশ্য ১৬ বছর বয়সী মেসির নামটা ঠিক করে দেয়।

স্পেনের বয়সভিত্তিক দল থেকেও তখন চা্ওয়া হচ্ছিল মেসিকে। কিন্তু দেশের ডাক সাড়া দিয়ে এজেইজায় অনুশীলন ক্যাম্পে যোগ দেন তিনি। চারদিন পর প্যারাগুয়ের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করা হয়। প্রায় দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে ৮-০ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। গোল করেছিলেন মেসি। সে ম্যাচে বিরতির সময় মেসির প্রতি হাঁক দেন ফিটনেস কোচ জেরার্ডো সালোরিও, ‘খোকা, ওঠো গা-গরম করো। খেলার ইচ্ছে নেই?’ বেঞ্চে মেসিকে দেখে অলস মনে হয়েছিল সালোরিও-র, ‘কথা বলার সময় মনে হচ্ছিল সে যেন ঘুম থেকে উঠল।’ সংবাদমাধ্যমক ‘আনফিবিয়া’কে এ কথা বলেন সালোরিও, ‘সেদিনের পর তার মুখে সব সময় সিংহের প্রতিচ্ছবি দেখেছি।

এরপর থেকেই সে জোরে দৌড়াতে শুরু করল। ওই প্রীতি ম্যাচের পর আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক দলে অপরিহার্য সদস্য হয়ে গেলেন মেসি। ২০০৫ দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপে করলেন ৬ গোল। এরপর অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে মেসি সেরা আকর্ষণ ছিলেন কি না তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে স্থানীয়দের কাছে চেনা মুখ ছিলেন সার্জিও আগুয়েরো। প্রিমেরা বিভাগের দল ইন্দিপেন্দিয়েন্তেতে ১৫ বছর বয়সেই অভিষক ঘটেছিল ‘কুন’ আগুয়েরোর। এমনকি এই আগুয়েরোও তখন মেসিকে চিনতেন না!

‘দেপোর টিভি’কে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড বলেন, ‘সে আমার পাশেই ছিল। লাওতারো ফরমিকা ও এজেকুয়েল গ্যারের সঙ্গে কথা বলছিলাম। এক পর্যায়ে যুক্তরাস্ট্র নিয়ে কী যেন বলল লিও। ফুটবল দেখতাম প্রচুর। তবে সব আর্জেন্টিনার। ইউরোপের না। লিওকে জিজ্ঞেস করলাম “তোমার কি নাম?” “লিওনেল” বলেই সে হাসিতে ফেটে পড়ল। জিজ্ঞেস করলাম, শেষ নামটা কি? মেসি, তার জবাব।’ পাশ থেকে একজন বলল, ওকে চেনো না। জানতাম বার্সেলোনায় প্রতিভাবান একটা ছেলে আছে। “এই তাহলে সেই”, বললাম এবং পরে অনুশীলনে বুঝে যাই সে কতটা ভালো।’

অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে তখন আর্জেন্টিনার হয়ে আলো ছড়ানোর প্রতীক্ষায় ফার্নান্দো গ্যাগো। স্পেনের ভরসা ছিলেন সেস্ক ফ্যাব্রেগাস। এমনকি যুক্তরাস্ট্রের ফ্রেডি আদুকে নিয়েও আলোচনা হচ্ছিল প্রচুর। মেসি ছিলেন এসব আলোচনার বাইরে। যুক্তরাস্ট্রের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে গুস্তাভো ওবারম্যানকে প্রাধান্য দিয়ে মেসিকে একাদশের বাইরে রেখেছিলেন কোচ ফ্রান্সিসকো ফেরারো। মেসির মাংশপেশীতে চোট ছিল। তাঁকে দ্বিতীয়ার্ধে খেলানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসক।বিরতির পর মেসি নেমে ঝলক দেখালেও কাজ হয়নি। আর্জেন্টিনা সে ম্যাচে ১-০ গোলে হারের পর বিস্তর সমালোচনা হয় কোচের এ সিদ্ধান্তের।

মিসরের বিপক্ষে পরের ম্যাচে শুরু থেকেই খেলেন মেসি। প্রথম গোলটাও আসে তাঁর পা থেকে। এরপর জার্মানিকে হারিয়ে নিশ্চিত হয় শেষ ষোলো। সে ম্যাচে তাঁকে পুরো সময় খেলাননি কোচ।মাঠ থেকে উঠে আসায় আপত্তি ছিল মেসির। তাঁর কোচের ভাষায়,‌ ‘সে রাতে ম্যাচের ভিডিওতে দেখলাম মেসির মুখটা শুকনো। কেন মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে, এমন ছিল ভাবভঙ্গী। কিছুক্ষণ পর সালোরিও কামরায় ঢুকে মেসিকে বলে, তোমাকে (মেসিকে) অমন চেহারা উপহার দেওয়ার জন্য দুঃখিত।’

গ্রুপপর্ব পারি দেওয়ার পর আর্জেন্টিনার মতো মেসিকেও আর থামানো যায়নি। নকআউট পর্বের সব ম্যাচেই গোল করেন তিনি। গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুট জিতে নেন মেসি। আর্জেন্টিনার সে দলটা থেকে ছয়জন খেলেছিলেন ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে। মেসি, জাবালেতা, আগুয়েরো, গ্যারায়, বিগলিয়া ও গ্যাগো। এদের মধ্যে মেসি যে সবচেয়ে বড় তারকা এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বড় তারকা হয়েও বাকি সতীর্থদের সঙ্গে তিনি এক কাতারে, ছোটদেরটা জেতা হলেও বড়দের বিশ্বকাপ যে এখনো অধরা।

Leave a Reply