ঋষি কাপুরের সঙ্গে শেষ আড্ডায়…

ঋষি কাপুরের সঙ্গে শেষ আড্ডায়…

বলিউডের বরেণ্য অভিনেতা ঋষি কাপুরের সঙ্গে দেখা হয়েছে একাধিকবার। শেষ দেখা হয়েছিল ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর। তখন কি আর জানতাম, এটাই আমাদের শেষ আড্ডা! তাঁর অভিনীত শেষ ছবি ‘দ্য বডি’ মুক্তির আগে ছিল এক দীর্ঘ আলাপচারিতা। ১১ মাস ১১ দিন ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে সবে জীবনের মূল স্রোতে ফিরেছিলেন তিনি।

সেদিনও সান অ্যান্ড স্যান্ড হোটেলে দুরুদুরু বুকে হাজির হয়েছিলাম এই বলিউড অভিনেতার সামনে। কারণ, মনের মতো প্রশ্ন না হলে রীতমতো রেগে যান তিনি। আর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন একদমই পছন্দ করেন না। সাক্ষাৎকারের শর্তই ছিল ক্যানসার আর আলিয়া-রণবীর নিয়ে কোনো প্রশ্ন নয়। স্ত্রী নিতু সিং কাপুরের সঙ্গে ‘বেলাশেষ’ ছবির রিমেকে অভিনয় করার কথা ছিল। ‘বেলাশেষ’-এর শেষটা আর হলো না।

অগ্রহায়ণের দুপুরের এই আড্ডায় গোলাপি রঙের টি–শার্টে সেদিন ঋষি ছিলেন আপাদমস্তক রোমান্টিক এক মানুষ। তাই দেখা হতে রোমান্টিক হাসি হেসে তিনি বলেছিলেন, ‘যদিও আমার বয়স ৬৭, কিন্তু আমার হৃদয় আজও তরুণ। আর রোমান্সের কোনো বয়স হয় না। মনেপ্রাণে আমি আজও রোমান্টিক।’ সেদিনের প্রশ্নোত্তর নিয়েই আজ বিদায়ের দিনে তাঁকে স্মরণ করছি।

অভিনয়ের আঙিনায় ৫০ বছর পার হতে চলেছে। কেমন ছিল এই অভিনয়–সফর?
আমি আমার কাজকে সব সময় উপভোগ করেছি। আমি খুবই আবেগপ্রবণ অভিনেতা। আমি মাথা দিয়ে অভিনয় করি না, করিনি। সব সময় মন দিয়ে অভিনয়কে ভালোবেসে কাজটা করেছি। ‘মেরা নাম জোকার’ ছবিটি ধরলে আগামী বছর এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমার ৫০ বছর হবে। তবে অভিনয়ের সফরটা এখনই শুরু হয়েছে বলা যায়। ২৫ বছর ধরে নায়ক হয়ে শুধু নেচে গেছি। বলিউডে দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে নেমে নিজেকে প্রতিটা ছবিতে নতুন নতুনভাবে আবিষ্কার করছি।

বলিউডে আপনার ইমেজ ছিল ‘চকলেট বয়ে’র। কিন্তু এখন আপনি সেই ইমেজ ভেঙে চুরমার করেছেন। ৯০ বছরের বৃদ্ধ থেকে দাউদ—নানান চরিত্রে দেখা যায় আপনাকে। এই দ্বিতীয় ইনিংস নিয়ে কিছু বলুন—
আমি আমার এই রোমান্টিক ইমেজ আগেই ভাঙতে চেয়েছিলাম। ২৫ বছর আগে আমি যা যা করতে চেয়েছিলাম, এখন তা করার সুযোগ পাচ্ছি। আগে আমাকে কেউ অন্য ধারার ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ দিত না। সুইজারল্যান্ডে গিয়ে নায়িকার সঙ্গে প্রেম করেছি। আগে ছবির গল্প বলতে ছিল, প্রেম-ভালোবাসা, প্রচুর মারপিট বা প্রথম অর্ধেকে ভাই–বোন হারিয়ে যাবে, আবার শেষভাগে সবাই সবাইকে ফিরে পাবে। সেসব বস্তাপচা গল্প থেকে এখন হিন্দি সিনেমা বেরিয়ে এসেছে।

মাল্টিপ্লেক্স আসার পর ছবির মান উন্নত হয়েছে। অন্য ধারার ছবি হচ্ছে। সিনেমা সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলেছে। নায়ক-নায়িকা ছাড়াই এখন গল্পপ্রধান হিন্দি সিনেমা হচ্ছে। চরিত্রাভিনেতাদের কাঁধে ভর করে এখন সিনেমা হিট হচ্ছে। এ ধারণার বদল এনেছেন অমিতাভ বচ্চন। উনিই প্রথমে দেখিয়েছেন চরিত্রাভিনেতারাও ছবির নায়ক-নায়িকা হতে পারে। তবে আমার দ্বিতীয় ইনিংস পুরো বৈচিত্র্যে ভরা। সব প্রথা ভেঙে নানান চরিত্রে অভিনয় করছি। আমি প্রমাণ করেছি আমিও ভালো অভিনেতা। আর আমার এখনকার অভিনীত প্রায় সব চরিত্রই প্রশংসিত হয়েছে। প্রচুর পুরস্কারও পাচ্ছি।

৫০ বছরের দীর্ঘ এই সফরে কোনো আক্ষেপ আছে কি? না, আমার কোনো আক্ষেপ নেই। রণবীরকে (ছেলে, বলিউড তারকা রণবীর কাপুর) আমি সব সময় বলি যে সফলতা যেন মাথায় চড়ে না বসে। আর ব্যর্থতা যেন হৃদয় চুরমার করে না দেয়। কোনো অভিনেতাই জীবনে ১০০ শতাংশ সফল হন না।

নিজের অভিনীত ছবি দেখেন? উঁহু, নিজের ছবি দেখতে পছন্দ করি না। এমনকি রণবীরের অধিকাংশ ছবি আমার দেখা হয়নি। রণবীরের কোনো ছবি দেখলে মনে হয় ও এটা ঠিক করেনি। এভাবে করা উচিত ছিল। নিতু আমার আর রণবীরের সব ছবি দেখে। আর ছবি দেখার পর নিতু ওর মতামত জানায়। নিতুর মতো আমার মা আমার অভিনীত সব ছবি দেখতেন। আর উনি আমার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিলেন। তবে আমি অন্য অভিনেতাদের ছবি দেখি।

বায়োপিকে অভিনয় করতে চান? বায়োপিকের জন্য আমি নিজেকে সবচেয়ে ভুল আর দুর্বল অভিনেতা বলে মনে করি। আমি কাউকে নকল করতে পারি না। আমি স্বতঃস্ফূর্ত অভিনেতা। আমি হৃদয় দিয়ে অভিনয় করি। তাই আমাকেও কেউ সহজে নকল করতে পারবে না।

প্রতিযোগিতায় বিশ্বাস করেন? আমার কোনো প্রতিযোগী আছে বলে আমি মনে করি না। আমি আমার কাজ খুব ভালোভাবে করছি। আমি জানি না এটা ঠিক না বেঠিক। তবে আমি নিজেকে সেরা মনে করি। আর যারা প্রতিযোগিতার কথা ভাবে, তারা খুবই নীচ মানসিকতার লোক বলে আমার মনে হয়।

নিতু সিংয়ের সঙ্গে কবে আবার আপনাকে পর্দায় দেখা যাবে? কে আর বুড়ো-বুড়ির রোমান্স দেখতে চায় (সশব্দে হেসে)। আমি আর নিতু ১৬টি ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছি। এর মধ্যে ১৩টি ছবিতে আমরা নায়ক-নায়িকা ছিলাম। সবাই চায় যে আমরা আবার একসঙ্গে কাজ করি। একটা ছবি করার কথা আছে। এই ছবিতে ৪০ বছরের বিবাহবার্ষিকীতে আমরা একে অপরের থেকে আলাদা হতে চলেছি। এই নিয়ে ছবিটা শুরু। এটা মূলত একটা বাংলা ছবি (বেলাশেষে)। ছবির বিষয়বস্তুটা দারুণ। ছবিটাও খুব হিট করেছিল।

কখনো কি চলচ্চিত্র ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যম আপনাকে আকর্ষণ করেছে? কেন করবে বলুন তো? এত বছর ধরে কাপুর পরিবারের অন্য কাউকে করেনি, আমায় কেন করবে। সিনেমা ছাড়া কাপুর পরিবার কিছু ভাবতে পারে না। আজ হিন্দি চলচ্চিত্রের বয়স ১১০ বছর। তার মধ্যে কাপুর পরিবারই ৯০ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করে চলেছে। ১৯২৭ সালে আমার দাদাজি পৃথ্বীরাজ কাপুর কাজ করা শুরু করেন। আমাদের পরিবারের চার প্রজন্ম এই মাধ্যমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পৃথ্বীরাজ কাপুর, রাজ কাপুর, রণধীর কাপুর, তারপর আমার ছেলে রণবীর কাপুর এই ফিল্মি দুনিয়ায় এসেছে। এই নিয়ে বিশ্ব রেকর্ড আছে।

এই প্রজন্মের অভিনেতাদের কীভাবে মূল্যায়ন করেন? রাজকুমার রাও, ভিকি কৌশল, আয়ুষ্মান খুরানা, রণবীর কাপুর, রণবীর সিং—এদের আমি অভিনেতা হিসেবে সম্মান করি। আমার যৌবনে আমি কখনোই ওদের মতো কাজের সুযোগ পাইনি। ১৯৭৩ সালে দর্শক কখনোই ‘বালা’ বা ‘ভিকি ডোনার’-এর মতো ছবি গ্রহণ করতে পারত না। এখন দর্শক অনেক বেশি শিক্ষিত। তাদের রুচি বদলেছে। এখন সবাই ছবির কনটেন্টকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আমাদের সময় কোনো নায়ক আয়ুষ্মানের মতো টাকলা হয়ে ‘বালা’-র মতো কোনো ছবি করার সাহস পেত না।

সেন্সর বোর্ড কাঁচি চালিয়ে এখনকার সিনেমাগুলো তছনছ করে। এই ব্যাপারে আপনার কী মত? এখন তো তেমন কিছুই কাটা হয় না। আমার বাবা ২২ বছর বয়সে ‘বরসাত’ বলে এক সিনেমা করেন। নার্গিস ছিলেন ছবির নায়িকা। এই সিনেমাটাকে ‘এ’ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। বাবা যখন কারণ জানতে চান, তখন বলা হয়, ছবিতে নার্গিসজি একবারও ওড়না পরেননি। যিনি ‘এ’ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন, তিনি এখনকার সিনেমা দেখলে তো হার্টফেল করেই মারা যাবেন। (সশব্দে হেসে)

আপনি তো তারকা পুত্র। ক্যারিয়ার শুরুর সময় দাদু, বাবার তারকাখ্যাতি আপনার ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলেনি?
এ প্রশ্নটা স্বজনপ্রীতি নিয়ে, তাই তো? কঙ্গনা বলে কেউ একজন আছেন, যিনি ‘স্বজনপ্রীতি’ নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। করণসহ অনেকেই এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বড় তারকাপুত্র তো রাজ কাপুর নিজেই। রাজ কাপুর শুধু পৃথ্বীরাজ কাপুরের সন্তান ছিলেন বলেই কি সেই উচ্চতায় পৌঁছতে পেরেছেন? আমি রাজ কাপুরের সন্তান বলেই কি ৪৫ বছর ধরে বলিউডে কাজ করে চলেছি? রণবীর আমার ছেলে বলেই কি আজ সে বলিউডের সুপারস্টার? আমাদের কারও কোনো যোগ্যতা না থাকলে কি আজ আমরা এত বছর ধরে এখানে কাজ করতে পারতাম! কারিনা, করিশমারও কি নিজেদের কোনো কৃতিত্ব নেই?

Leave a Reply