নির্দেশনার চেয়ে কাজ করছেন বেশি শ্রমিক

নির্দেশনার চেয়ে কাজ করছেন বেশি শ্রমিক

আশুলিয়ার সাউদার্ন গার্মেন্টস নামের একটি পোশাক কারখানায় মোট শ্রমিক ১ হাজার ৯২৮। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ শ্রমিকই গতকাল বৃহস্পতিবার উপস্থিত ছিলেন। কারখানাটি শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করেছে। এ ছাড়া রাখা হয়েছে শরীরের তাপমাত্রা মাপা, জীবাণুনাশক দিয়ে জুতা পরিষ্কার, হাত ধোয়াসহ নানা ব্যবস্থা। কিন্তু কারখানা খোলার খবর পেয়ে নিজ উদ্যোগে অনেক শ্রমিক কর্মস্থলে ফিরে আসায় কারখানা অভ্যন্তরে শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

এত শ্রমিকের কাজে যোগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সাউদার্ন গার্মেন্টসের পরিচালক দাউদ মোহাম্মদ হাসান জাহিদ গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে গত রোববার ৩০ শতাংশের কম শ্রমিক নিয়েই কারখানা চালু হয়। পরে শ্রমিকেরা নিজ উদ্যোগে কাজে ফিরতে শুরু করায় কারখানায় শ্রমিকের উপস্থিতি বেড়ে যায়। তাতে শারীরিক দূরত্ব মানার বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে স্বীকার করেন তিনি।

এ ছাড়া ঢাকার অদূরে সাভারের উলাইল এলাকার আল-মুসলিম গ্রুপের কারখানায় ১৮ হাজার শ্রমিকের মধ্যে গতকাল কাজ করেছেন ৫৫ শতাংশ বা প্রায় ১০ হাজার। সাউদার্ন ও আল-মুসলিমের মতো অনেক কারখানা পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নির্দেশনার চেয়ে বেশিসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে কাজ করাচ্ছে।

বিজিএমইএ প্রথম ধাপে ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত ৩০ শতাংশ শ্রমিক দিয়ে সীমিত পরিসরে কারখানা চালানোর নির্দেশনা দিয়েছিল। পরবর্তী ধাপে শ্রমিকের সংখ্যাটি ৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ ছিল সংগঠনটির। কিন্তু শুরু থেকেই বিজিএমইএর এ নির্দেশনা মানেনি অনেক কারখানা। কেউ কেউ শুরুতেই ৫০ শতাংশ শ্রমিক নিয়ে কারখানা চালু করে।

নির্দেশনা না মেনে বেশিসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোয় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা মুশকিল হচ্ছে। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে। অন্যদিকে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সদস্য কারখানার ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটছে। ধাপে ধাপে কারখানা খোলার কথা থাকলেও সেটি অমান্য করে তাদের অনেকে আগেভাগেই উৎপাদন শুরু করেছে। দূরদূরান্ত থেকে শ্রমিক আনার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেটি মানেননি অনেক পোশাকশিল্পের মালিক।

একাধিক পোশাকশিল্পের মালিক স্বীকার করেন, ধাপে ধাপে শ্রমিক বাড়ানোর নির্দেশনা থাকলেও সেটি অনেক ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। তাতে শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কারখানায় আসা-যাওয়ার পথেও একই সমস্যা হচ্ছে। কারখানাগুলো স্বাস্থ্যবিধি মানছে কি না, সেটি তদারক করতে প্রতিদিনই কিছু কারখানা পরিদর্শন করে বিজিএমইএর বেশ কয়েকটি দল। গত বুধবার ৪৮ কারখানা পরিদর্শনের একটি প্রতিবেদন প্রথম আলোর কাছে এসেছে। তাতে দেখা যায়, ২১টি কারখানাই ৫০ শতাংশের বেশি শ্রমিক নিয়ে উৎপাদন চালাচ্ছে। মাত্র ১২টি কারখানায় ৩০ শতাংশের কম শ্রমিক কাজ করছেন। তবে শ্রমিকের মাস্ক পরিধান, হাত ধোয়ার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করায় ৪৭টি কারখানার কার্যক্রমকে বিজিএমইএ সন্তোষজনক বলেছে।

জানতে চাইলে শিল্প পুলিশ সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, কিছু পোশাক কারখানা স্বাস্থ্যবিধি মানছে। আবার কিছু কারখানা মানছে না। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে শ্রমিকদের শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা যাচ্ছে না। একেকটি মেশিনের মধ্যকার দূরত্ব ছয় ফুট রাখার কথা থাকলেও অধিকাংশ কারখানাই সেটি করতে পারেনি। তবে শ্রমিকদের মাস্ক ব্যবহার শতভাগ কারখানা নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে বিজিএমইএর সহসভাপতি আরশাদ জামাল গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে সরাসরি রপ্তানিকারক ২ হাজার ২৭৪টি কারখানা। এসব কারখানায় কাজ করেন ২৪ লাখ ৩৫ হাজার শ্রমিক। এর মধ্যে ১০ লাখ ৩৮ হাজার বা ৪২ শতাংশ শ্রমিক বর্তমানে কাজ করছেন। সংখ্যাতত্ত্বের কারণে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানায় ৩০ শতাংশ শ্রমিক নিয়ে কারখানা চালানোর বিষয়টি মানা যায়নি। কারণ, সেসব কারখানার আশপাশেই অধিকাংশ শ্রমিক বসবাস করেন। ফলে উৎপাদন চালু হওয়ার পর তাঁরা চলে এসেছেন। তবে বড় কারখানায় এমনটি হয়নি।’

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে একাধিকবার অনুরোধের পর গত ৬ এপ্রিল কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত দেয় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। পরে সেই বন্ধ ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তার মধ্যেই সরকারের সবুজ সংকেত পেয়ে ২৬ এপ্রিল থেকে কারখানা খোলার প্রক্রিয়া শুরু করে সংগঠন দুটি। কারখানা চালু করতে কী কী বিষয় পরিপালন করতে হবে, সে বিষয়ে গত ২২ এপ্রিল সদস্যদের একটি গাইডলাইন বা নির্দেশনা দেয় বিজিএমইএ। তাতে ২ মে পর্যন্ত প্রথম ধাপে ৩০ শতাংশ শ্রমিক নিয়ে কারখানা চালানোসহ অন্যান্য বিষয়ের উল্লেখ ছিল। পরে আরেকটি গাইডলাইনে প্রাথমিক ধাপে স্যাম্পল, ফিনিশিং ও সুইং সেকশন আংশিক খোলা রাখার পরামর্শ দেয় বিজিএমইএ। তারপর গত শনিবার বিকেএমইএও তাদের সব সদস্য কারখানাকে স্যাম্পল, নিটিং ও ডাইং সেকশন পরদিন রোববার থেকে চালুর নির্দেশনা দেয়। পাশাপাশি বলা হয়, সুইংসহ (সেলাই) অন্যান্য সেকশন ২ মে থেকে খোলা যাবে। তবে জরুরি রপ্তানি ক্রয়াদেশ থাকলে সংশ্লিষ্ট কারখানার সব সেকশন চালাতে পারবে।

এলাকাভেদে সীমিত পরিসরে ধাপে ধাপে কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল বিজিএমইএ। এ ক্ষেত্রে তাদের নির্দেশনা ছিল, রবি ও সোমবার ঢাকার ২১৩টি কারখানা চালু হবে। আশুলিয়া, সাভার, ধামরাই ও মানিকগঞ্জের কারখানা খুলবে ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল। এ ছাড়া রূপগঞ্জ, নরসিংদী ও কাঁচপুরের কারখানা ৩০ এপ্রিল এবং গাজীপুর ও ময়মনসিংহের কারখানা চালু হবে ২ ও ৩ মে। তবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত শুধুই নিটিং, ডাইং ও স্যাম্পল (নমুনা) সেকশন, ২ মে কাটিং এবং ৩ মে থেকে সেলাই বা সুইং সেকশন চালু করতে পারবে কারখানাগুলো। ২ ও ৩ মে গাজীপুর ও ময়মনসিংহে কারখানা চালুর নির্দেশনা থাকলেও দুই জায়গায় বিজিএমইএর ৮৮০টি সদস্য কারখানার মধ্যে গতকাল ৪১৬টিই উৎপাদন চালিয়েছে।

শিল্প পুলিশ জানায়, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও খুলনায় সব মিলিয়ে বিজিএমইএর ৮৬৭টি সদস্য কারখানা গতকাল চালু ছিল। এসব এলাকায় বিকেএমইএর ২২৩টি ও বিটিএমএর সদস্য ৯৭টি বস্ত্রকল উৎপাদন শুরু করেছে। তা ছাড়া রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) ৩৬৪ কারখানার মধ্যে ২৭০টি চালু হয়েছে। তার মধ্যে বেশ কিছু পোশাক কারখানাও রয়েছে।

জানতে চাইলে বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, পণ্য সরবরাহ করতে ক্রেতাদের চাপাচাপির কারণে অনেক কারখানামালিক নির্দেশনার চেয়ে বেশিসংখ্যক শ্রমিক কাজ করাতে বাধ্য হচ্ছেন। তাতে শ্রমিকদের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা মুশকিল হচ্ছে।

এদিকে এপ্রিল মাস শেষ হলেও ১৮৫টি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা গত মার্চের মজুরি পরিশোধ করেনি। তার মধ্যে বিজিএমইএর ৮৯, বিকেএমইএর ৭১ ও বিটিএমএর ২৫টি কারখানা গতকাল পর্যন্ত মজুরি দেয়নি। বকেয়া মজুরি পরিশোধসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল আশুলিয়ার গ্রিন লাইফ ক্লথিং, হেংটন বিডি, ভার্টিক্যান ফ্যাশন, ইয়ং স্মার্ট, গাজীপুরের আলাউদ্দিন অ্যান্ড সন্স, ব্রাইট অ্যাপারেল, গোরিয়ান ফ্যাশন, দুরন্ত নিট, স্টাইলিস্ট গার্মেন্টস, ড্রেসডেন টেক্সটাইল, সানড্রিলা ফ্যাশন, নারায়ণগঞ্জের অন্তিম নিটিং ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং, জ্যাজ অ্যাপারেল, আলপিয়ান নিট এবং চট্টগ্রামের এক্সিম ফ্যাশনের শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছেন বলে জানায় শিল্প পুলিশ।

Leave a Reply