ঈদপোশাক প্রস্তুত, বিকিকিনি নিয়ে অনিশ্চয়তা

ঈদপোশাক প্রস্তুত, বিকিকিনি নিয়ে অনিশ্চয়তা

ঈদের কেনাকাটার একটা বড় অংশ পোশাক ঘিরে। বাংলাদেশের ফ্যাশন বাজারের মূল বিকিকিনি হয়ে থাকে ঈদুল ফিতরের সময়টায়। সে জন্য ঈদের বাজার ধরতে দেশি ফ্যাশন হাউস ও পোশাকের দোকানগুলোর থাকে বিশেষ প্রস্তুতি। রমজান মাসের শুরুর এ সময় জমজমাট থাকার কথা সব বাজারই। পোশাকের দোকানে থাকা ম্যানিকিনের পরনে আর তাকের পর তাক ভরে থাকার কথা নতুন নতুন পোশাকে। এ বছর চিত্রটা একেবারেই অনুপস্থিত।

করোনাভাইরাস সংক্রমণে বিশ্বজুড়েই এখন দুঃসময়। বাংলাদেশেও মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে বন্ধ অফিস–আদালত, শপিং মল, দোকানপাট। ঘরে থেকে বেরোনোর ব্যাপারেও আছে কড়াকড়ি। এরই মধ্যে পোশাক বেচাকেনার আরেকটি উৎসব পয়লা বৈশাখ পার হয়ে গেছে। গুদামের পোশাক আর বাজারের মুখ দেখেনি। ঈদুল ফিতরের আগে এ অবস্থার কতটুকু উন্নতি ঘটবে, তা কেউ জানেন না। ঈদের পোশাক প্রস্তুত, কিন্তু ক্রেতার হাতে তা পৌঁছাবে কী করে, সে ভাবনাই এখন ফ্যাশন হাউসগুলোর।

শুধু ঈদুল ফিতরের সময়েই দেশের পোশাকবাজারের পরিমাণ চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার। সারা দেশের বড়–ছোট পাঁচ হাজার ফ্যাশন হাউস ও দোকান মিলিয়ে এই বেচাকেনা হয়ে থাকে। এ তথ্য জানিয়ে ফ্যাশন হাউসগুলোর সংগঠন ফ্যাশন এন্টারপ্রেনরস অ্যাসোিসয়েশন অব বাংলােদশ— ফ্যাশন উদ্যোগের সভাপতি শাহীন আহম্মেদ বললেন, যদি মার্কেট বা দোকান খোলা না যায়, তাহলে পণ্য আটকে যাবে। সে ক্ষেত্রে অনলাইনে বেচাকেনা করতে হবে। ফ্যাশন উদ্যোগের সদস্য প্রায় ২৫০ ফ্যাশন হাউস।

তাদের সবার জন্য একটি ই–কমার্স সমাধান বের করা যায় কি না, সে ব্যাপারে দেখছে সংগঠনটি। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস নিজস্ব উদ্যোগেও অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করছে। একই রকম কথা শোনালেন ফ্যাশন হাউস কে ক্র্যাফটের প্রধান নির্বাহী খালিদ মাহমুদ খান। তিনি বললেন, বিচ্ছিন্নভাবে অনলাইনে ঈদের পোশাক বিক্রির চেষ্টা চলছে। তবে সেগুলোর সরবরাহের প্রক্রিয়া নিয়েও জটিলতা আছে। চাল–ডালের মতো পোশাককে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে না ফেললে এসব পণ্য বহনও করা যাবে না।

পরিস্থিতির যদি খুব বেশি উন্নতি না ঘটে, তবে অনলাইন বিপণনের বিকল্প হাতে নেই ফ্যাশন হাউসগুলোর। এমনিতে মোট বিক্রির তুলনায় অনলাইনে বেচাকেনার পরিমাণ নগণ্য। দেশের শীর্ষ ফ্যাশন হাউস ও কারুপণ্য বিপণন প্রতিষ্ঠান আড়ংয়ের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, ‘আমরা দিন কয়েক আগে থেকে অনলাইনে ঈদের পোশাক বিক্রি শুরু করেছি। আগেও এটা ছিল। এখন ঢাকার ভেতরে সরবরাহ করছি। অনলাইন বিক্রির পরিমাণ খুবই কম।

গত বছর মোট বিক্রির ১ শতাংশ ছিল অনলাইনের বেচাকেনা। এবার হয়তো এটা ২ শতাংশে যেতে পারে।’ তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, আড়ংয়ের সারা বছরের বেচাকেনার ৩৫ শতাংশই হয় এই ঈদে। ৮–৯ শতাংশ হয় বৈশাখে। আশরাফুল আলম বললেন, ‘এবারে বৈশাখে তো পুরোটাই হারালাম। ঈদে ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছিল আড়ংয়ের। করোনা পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক বেচাকেনার আশাই তো করা যাচ্ছে না।’

বেশির ভাগ ফ্যাশন হাউসের ঈদপণ্য হয় প্রস্তুত, নয়তো প্রায় তৈরি—এমন অবস্থায় কারখানা, দোকান সব বন্ধ হয়ে গেছে গত মাসেই। তবে সুযোগ পেলেই সবাই ক্রেতার হাতে পোশাক তুলে দিতে পারবেন উদ্যোক্তারা। এই সময়ে ‘রিভেঞ্জ বায়িং’ শব্দ দুটিও শোনা যাচ্ছে। এর ব্যাখ্যা দিলেন লা রিভের প্রধান নির্বাহী মুন্নুজান নার্গিস। দীর্ঘদিন ঘরবন্দী থাকার পর যখন মানুষ বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পাবে, তখন একটা ব্যাপক কেনাকাটা দেখা যেতে পারে। সেই সুদিনের আশা করাই যায়। তবে ঈদ মৌসুমে আপাতত অনলাইনের ওপরেই ভরসা লা রিভের। মন্নুজান নার্গিস বললেন, আমাদের অনলাইন বিক্রি ৫ শতাংশের বেশি নয়। সামাজিক দূরত্ব এবং সব ধরনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে সীমিত আকারেও যদি বিক্রয় সহায়তা করা যেত, তবে সুবিধা হতো।

এই মুহূর্তে ঈদের পোশাক বিকিকিনি নিয়ে ভাবছেন না ফ্যাশন ডিজাইনারস কাউন্সিল অব বাংলাদেশের সভাপতি মাহিন খান। বললেন, ‘বৈশাখের কাজও হয়েছিল, ঈদের পোশাকও তৈরি ছিল। কিন্তু এখন তো কেনাকাটার মানসিকতাই নেই। এই দুঃসময়ে আমাদের কারুশিল্পীদের বাঁচাতে হবে। তাঁদের পাশে আমরা সাংগঠনিকভাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। আমরা শুরুতে ২৫টি পরিবারের জন্য পুরো মাসের খরচ দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

সরকারি ঘোষণার আগেই বিশ্বরঙের সব শাখা বন্ধ করা হয়েছিল—জানালেন ফ্যাশন হাউসটির প্রধান বিপ্লব সাহা। তিনি বললেন, ‘এখন আমরা অনলাইনে বেচাকেনার ব্যাপারটা গোছাচ্ছি। সীমিত আকারে হলেও ঈদের পোশাক সরবরাহ করা যাবে। আমাদের অনেক ক্রেতাই যোগাযোগ করছেন, আমরাও চেষ্টা করছি নিরাপদে কীভাবে পণ্য সরবরাহ করা যায়।’

ক্যাটস আইয়ের পরিচালক সাদিক কুদ্দুছ জানালেন, ‘সারা বছর ধরেই ঈদ মৌসুমের প্রস্তুতি চলে। কিন্তু এখন দিন দিন পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। ঈদ পোশাক আমাদের ওয়েবসাইটে রাখা শুরু করেছি। অনলাইনে যা হয়, সেই বিকিকিনি নিয়েই এবার সন্তুষ্ট থাকতে হবে।’

করোনা নামের এই বৈশ্বিক মহামারি প্রকোপ কবে শেষ হবে, কেউ হলফ করে বলতে পারে না। এদিকে এসেছে দেশি ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় মৌসুম। বেচাকেনার লোকসানের পাশাপাশি রয়েছে আর্থিক নানা চাপ—কর্মীদের বেতন–বোনাস, ব্যাংকঋণের কিস্তি ইত্যাদি। অনলাইনে যতটুকু বিক্রি বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে ফ্যাশন হাউসগুলো।

Leave a Reply